হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,
মজিদুল ইসলাম শাহ
সারসংক্ষেপ
ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের সময় রাজআত একটি বিশেষ ‘খাঁটি’ শ্রেণির মানুষের জন্য নির্দিষ্ট। এর মধ্যে রয়েছেন পরিপূর্ণ মুমিন এবং একেবারে খাঁটি কাফের। রেওয়ায়েত অনুযায়ী, এই দলটির মধ্যে রয়েছেন হযরত ঈসা (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর মতো নবীগণ; সকল নিষ্পাপ ইমাম-বিশেষ করে ইমাম হুসাইন (আ.), যিনি প্রথম রাজআতকারী; সালমান ও মিকদাদের মতো বিশ্বস্ত সাহাবিগণ; বেলায়াতের পথে শাহাদাতবরণকারীরা। অপরদিকে, খাঁটি কাফের ও মুনাফিকরাও রজআত করবে। প্রত্যেকেই ঐশী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং পূর্ণাঙ্গভাবে নিজেদের শাস্তি বা পুরস্কার লাভের উদ্দেশ্যে পুনরায় দুনিয়ায় ফিরে আসবে।
রাজআতের ধারণা ও তা পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা
মাহদীবাদ-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় বিষয়গুলোর অন্যতম হলো ‘রাজআত’-অর্থাৎ হজরত ইমাম মাহদী (আ.)-এর পূর্ণাঙ্গ আবির্ভাবের প্রাক্কালে একদল মৃত মানুষের পুনরায় পার্থিব জীবনে ফিরে আসা।
কুরআনের আয়াত এবং অসংখ্য বর্ণনায় যার ভিত্তি রয়েছে, এই ধারণাকে কেন্দ্র করে বহু প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-এই বিস্ময়কর পুনরাগমনের অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিরা কারা?
এই বিষয়ে ব্যাপক পর্যালোচনা করলে এমন একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিবিন্যাস পাওয়া যায়, যেখানে মানুষের ঈমান বা কুফরের পরিপূর্ণতা ও বিশুদ্ধতার মাত্রার ভিত্তিতে তাদের রজআতের যোগ্যতা বা প্রয়োজনীয়তা নির্ধারিত হয়।
মূলনীতি: রাজআত ‘খাঁটিদের’ জন্য নির্দিষ্ট
প্রথম উত্তর হলো, শিয়া চিন্তাবিদদের মধ্যে প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, রাজআত ‘খাঁটি’ ব্যক্তিদের জন্য নির্দিষ্ট।[১]
এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত তারা, যারা ঈমান অথবা কুফরের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ও পরিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অন্য কথায়, রাজআত পরিপূর্ণ ও খাঁটি মুমিনদের পাশাপাশি একেবারে খাঁটি কাফের ও মুশরিকদেরও অন্তর্ভুক্ত করে।
এই সাধারণ মূলনীতিই রাজআত-সংক্রান্ত আলোচনার প্রধান কাঠামো নির্ধারণ করে। আহলে বাইত (আ.)-এর সূত্রে অসংখ্য বর্ণনা আমাদের কাছে পৌঁছেছে, যা এই মতকে সমর্থন করে এবং এই কাঠামোর মধ্যে বিশেষ বিশেষ শ্রেণির মানুষের পুনরাগমনের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে।
নবী ও আল্লাহর ওলিগণ রাজআতকারীদের অন্তর্ভুক্ত
রাজআতকারী নবীদের মধ্যে হজরত ইসমাঈল (আ.)-যিনি ‘সাদিকুল ওয়াদ’ বা প্রতিশ্রুতিতে সত্যবাদী হিসেবে পরিচিত-এবং হযরত ঈসা (আ.)-এর নাম উল্লেখ করা যায়।
এছাড়াও হজরত খিজির (আ.)-এর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি সর্বদা জীবিত এবং ইমাম মাহদী (আ.)-এর সঙ্গে থাকবেন।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং আমিরুল মুমিনীন হজরত আলী (আ.)-এর মহান ব্যক্তিত্বও এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে।
রাজআতে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বিশেষ মর্যাদা
রাজআতকারীদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে বেশি উল্লেখিত নাম হলো সাইয়্যেদুশ শুহাদা, ইমাম হুসাইন (আ.)।
রেওয়ায়েত অনুযায়ী, সর্বপ্রথম যার জন্য পৃথিবী বিদীর্ণ হবে এবং যিনি দুনিয়ায় ফিরে আসবেন, তিনি হলেন ইমাম হুসাইন (আ.)।[২]
তাঁর প্রত্যাবর্তনের বিশেষ কিছু দিক রয়েছে। যেমন, ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন, তিনি এত দীর্ঘ সময় শাসন করবেন যে দীর্ঘ বয়সের কারণে তাঁর ভ্রু চোখের ওপর এসে পড়বে।[৩]
অন্য রেওয়ায়েতে এসেছে, ইমাম মাহদী (আ.)-এর শাসনের শেষ পর্যায়ে ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গীদের নিয়ে ফিরে আসবেন। তিনি নিজেকে সকল মানুষের কাছে পরিচিত করবেন, যাতে কোনো ধরনের সন্দেহ অবশিষ্ট না থাকে।
এরপর ইমাম মাহদী (আ.)-এর ইন্তেকালের পর ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁকে গোসল দেবেন, কাফন পরাবেন এবং দাফন করবেন।[৪]
অন্যান্য নিষ্পাপ ইমামগণও তাঁর সঙ্গে রাজআত করবেন।
বিশেষ ও বিশ্বস্ত সাহাবিগণ রাজআতে
অন্যদিকে, রেওয়ায়েতগুলো মহানবী (সা.) এবং আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর কিছু বিশিষ্ট ও মর্যাদাবান সাহাবির নামও রাজআতকারীদের অন্তর্ভুক্ত করেছে।
তাদের মধ্যে রয়েছেন—
- সালমান ফারসি,
- মিকদাদ,
- জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ আনসারি,
- মালিক আশতার নাখঈ,
- মুফাজ্জাল ইবনে উমর।
এছাড়াও আসহাবে কাহফকেও রাজআতকারীদের আরেকটি দল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনে যাদের দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে থাকার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।[৫]
শহীদ ও বেলায়াতের পথে নিহত ব্যক্তিরা
রাজআতের অন্তর্ভুক্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণি হলো আল্লাহর পথে শহীদ ও নিহত ব্যক্তিরা।
বিশেষ করে বেলায়াতের পথে নিহতদের ক্ষেত্রে বিষয়টি প্রযোজ্য। ইমাম বাকির (আ.)-এর তাফসির অনুযায়ী, ‘আল্লাহর পথ’ বলতে হজরত আলী (আ.) এবং তাঁর সন্তানদের পথে নিহত হওয়াকে বোঝানো হয়েছে।
তিনি জাবিরকে মহান আল্লাহর এই আয়াত-
“আর যদি তোমরা আল্লাহর পথে নিহত হও অথবা মৃত্যুবরণ কর...”[৬]
-এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, ‘আল্লাহর পথ’ বলতে আলী (আ.) ও তাঁর বংশধরদের পথে নিহত হওয়াকে বোঝানো হয়েছে। আর যে ব্যক্তি তাঁর বেলায়াতের পথে নিহত হয়, সে আল্লাহর পথেই নিহত হয়েছে।
এরপর তিনি বলেন, এমন কোনো মুমিন নেই যার ক্ষেত্রে এই আয়াত প্রযোজ্য হবে না; কারণ সে একই সঙ্গে নিহতও হবে এবং মৃত্যুবরণও করবে। আর এই দুই অবস্থা-নিহত হওয়া ও স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ-উভয়টি বাস্তবায়নের জন্য তাকে অবশ্যই পুনরায় ফিরে আসতে হবে।[৭]
বিপরীত দিকে খাঁটি কাফের ও মুনাফিকরা
মুমিনদের বিপরীতে এমন কাফের ও মুনাফিকরাও রয়েছে, যারা কুফরের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ও পরিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তারা আল্লাহর শাস্তি ভোগ করা এবং নিজেদের পরাজয় ও লাঞ্ছনা প্রত্যক্ষ করার জন্য দুনিয়ায় ফিরিয়ে আনা হবে।
এই প্রত্যাবর্তন পূর্ণাঙ্গ ঐশী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি মাধ্যম হবে, যাতে প্রত্যেক শ্রেণি তার প্রকৃত শাস্তি অথবা পুরস্কার লাভ করতে পারে।
‘সব মুমিনের’ প্রত্যাবর্তন-এই আপত্তির পর্যালোচনা
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-‘ রাজআত’ এবং ‘ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের সময় জীবিত হয়ে ওঠা’-এই দুটি ধারণার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
কখনো কখনো কিছু রেওয়ায়েতে ‘সকল মুমিনের’ ব্যাপকভাবে ফিরে আসার কথা বলা হয়েছে। প্রথম দৃষ্টিতে এটি পূর্বে উল্লিখিত ‘খাঁটিদের জন্য নির্দিষ্ট’ মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হতে পারে।
কিন্তু এসব রেওয়ায়েত, বিশেষ করে ইমাম বাকির (আ.) থেকে বর্ণিত বক্তব্য গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে এই সাধারণ প্রত্যাবর্তনও সেইসব মুমিনদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যারা বেলায়াতের আয়াতে ঈমান এনেছে এবং ‘মৃত্যুবরণ’ ও ‘নিহত হওয়া’-উভয় অবস্থার বাস্তবায়নের জন্য তাদের পুনরায় ফিরে আসা অপরিহার্য।
এই অধ্যায়ের অন্যান্য হাদিসের সহায়তায় বলা যায় যে, এই দলটিও সেই ‘খাঁটি মুমিনদের’ অন্তর্ভুক্ত, যাদের প্রকৃত ঈমান কুরআনের দৃষ্টিতে তাদের এই সম্মানজনক রাজআতের কারণ হয়ে থাকে।[৮]
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, রাজআত কোনো সর্বজনীন ঘটনা নয়; বরং এটি বিশেষ কিছু শ্রেণির মানুষের জন্য নির্দিষ্ট।
তাঁদের মধ্যে রয়েছেন:
- হজরত ঈসা (আ.), হজরত ইসমাঈল (আ.), হজরত খিজির (আ.) ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মতো নবীগণ;
- সকল নিষ্পাপ ইমাম (আ.), বিশেষ করে ইমাম হুসাইন (আ.), যিনি প্রথম রাজআতকারী;
- সালমান, মিকদাদ, জাবির ও মালিক আশতারের মতো খাঁটি মুমিন ও বেলায়াতের পথের অনুসারীগণ;
- আলী (আ.) ও তাঁর সন্তানদের পথে নিহত সকল ব্যক্তি;
- এবং বিপরীত দিকে, খাঁটি কাফের ও মুশরিকরা, যারা ঐশী শাস্তি প্রত্যক্ষ করার জন্য ফিরে আসবে।
সুতরাং, এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দুটি শ্রেণির রেওয়ায়েতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। প্রথম শ্রেণির রেওয়ায়েতে ‘খাঁটিদের’ জন্য রাজআতের সাধারণ মূলনীতি তুলে ধরা হয়েছে; আর দ্বিতীয় শ্রেণির রেওয়ায়েতে এই মূলনীতির বিশেষ বিশেষ দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা হয়েছে।
এই দুই ধরনের রেওয়ায়েতকে একত্রে বিবেচনা করলে ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের সময় কারা পুনরায় এই পৃথিবীতে ফিরে আসবেন-সে বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুসংগত চিত্র পাওয়া যায়।
তাঁরা পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে এসে ইমাম মাহদী (আ.)-এর ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যাপী সরকার প্রতিষ্ঠা ও ঐশী ন্যায়বিচার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।
এই প্রত্যাবর্তন হলো ঐশী ন্যায়বিচার ও পূর্ণতার এক প্রকাশ-যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি তার অন্তর্নিহিত সত্যতা ও ঈমানের বিশুদ্ধতার মাত্রা অনুযায়ী শেষ যুগে একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা লাভ করবে।
সূত্র
[১] তাফসিরে বুরহান, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪০৮।
[২] আল-ইযামুল নাসিব, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৬০; বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৫৩, পৃষ্ঠা ৪৬।
[৩] বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৫৩, পৃষ্ঠা ৪৬।
[৪] বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৫১, পৃষ্ঠা ৫৬।
[৫] ইমাম মাহদী (আ.) সম্পর্কে একশ প্রশ্ন ও উত্তর, পৃষ্ঠা ২৬৬।
[৬] সূরা আলে ইমরান, ১৫৭।
[৭] মুখতাসারু বাসায়িরিদ দারাজাত, পৃষ্ঠা ২৫; তাফসিরুল আইয়াশি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২০২, হাদিস ১৬২; বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৫৩, পৃষ্ঠা ৪০, হাদিস ৮; আরও দেখুন: মুহাম্মাদি রেইশাহরি, দানেশনায়ে ইমাম মাহদী, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৪৭ ও ৪৯।
[৮] মুহাম্মাদি রেইশাহরি, দানেশনায়ে ইমাম মাহদী, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৪৯।
আপনার কমেন্ট